২৬ শে জুন , ২০২৫
শ্রীমন্মহাদেবায় নমঃ শিবায় 🚩
🚩 আত্মনির্বাণ ষষ্ঠক স্তুতি ( সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় পদ্যাকারে রচিত ) :-
( মূল সংস্কৃতে রচিত নির্বাণ ষঠকম স্তোত্র , যা মূলত স্মার্ত মতাদর্শনের প্রণেতা আচার্য শঙ্করের আত্মবোধ হতে রচিত ।
আচার্য শঙ্কর একজন শৈবদর্শন-পরম্পরার ঘোর বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও , "আমি কে ? পরম সত্য কি ? সবার মধ্যস্থিত মূল আত্মতত্ব কে ?" এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই তিনি বেদসার শৈবমতদর্শনের চূড়ান্ত মহাবাক্য যা উপনিষদ দ্বারাও প্রতিপাদিত , সেই "অহম ব্রহ্মস্মি" , "তত্বমসি ব্রহ্ম" বা "অহম রুদ্রের্ভি" বা "অহম শিবম শিবশ্চহম তঞ্চপি শিবমেব চ" অর্থাৎ , 'আমিই ব্রহ্ম , তুমিও সেই ব্রহ্ম , আমিই সেই রুদ্র বা আমি শিব সেই শিবই আমি ও তুমি সেই সাথে সমস্ত কিছুই শিব' এই বাক্যকেই তিনি পরম রূপে উপলব্ধি করেন এবং শৈবদর্শন বিরোধী হয়েও পরোক্ষভাবে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি শিবাদ্বৈত শৈবদর্শনের এই সারবাক্য - "আমি তুমি আদি এ সমস্ত সৃষ্টিই সেই ব্রহ্ম আর সেই অদ্বিতীয় ব্রহ্মই শিব"-কেই স্বীকার করে , নির্বাণষঠকম স্তোত্র টির রচনা করেন যেখানে তার স্তুতির মূলবাক্য ছিলো - "চিদানন্দরূপঃ শিবহোহম শিবহোহম" ।
এই অত্যন্ত শ্রুতিমধুর ও তাত্ত্বিক সংস্কৃত ভাষার স্তোত্রটির অনুপ্রেরণায় আমি , বাংলার শিবভক্তদের কথা মাথায় রেখে ও তাদের পড়বার, বোঝবার সুবিধার্থে স্তোত্রটি এই আত্মনির্বাণ ষষ্ঠক স্তুতি নামে প্রথম বাংলা ভাষায় পদ্যাকারে নিজের মতন করে নিজের ভাব ও কবিশৈলীর দক্ষতা অনুযায়ী অনুবাদ ও রচনা করলাম , যেহেতু বাংলার অনেক শিব ভক্তরা রয়েছেন যারা সংস্কৃত বা হিন্দি আদি ভাষায় রচিত বা লিখিত স্তব স্তোত্র বুঝতে বা পড়তে , উচ্চারণ করতে পারেন না , তাই মাতৃভাষা বাংলাতে তাদের ও সকল বঙ্গ সনাতনীদের পড়বার বোঝবার জন্যে সহজ সরল শব্দযোগে এটির রচনা । )
![]() |
| ।। সকলের আত্মস্থিত পরমতত্ব সচ্চিদানন্দ পরমাত্মা ভগবান রুদ্র ।। |
🚩আত্মনির্বাণ ষষ্ঠক স্তুতি ( সম্পূর্ণ বাংলায় ) :- |
( সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় পদ্যকার ও বঙ্গানুবাদ সহিত )
মন বুদ্ধি চিত্ত না আমি অহংকার
না চক্ষু নাসিকা না সুস্বাদ জিহ্বার ।
না জল বায়ু অগ্নি নই আকাশ ভূমি
জড় এই দেহের শিব চেতনাত্মা তুমি ।।১।।
👉 আমি না তো মন বুদ্ধি বা চিত্ত না তো অহংকার , না চোখ মুখ নাক আর না তো আমি জিভের দ্বারা গ্রহণ করা কোনরকম স্বাদ । আমি জল বায়ু অগ্নি মহাকাশ ও পৃথিবী আদি পঞ্চভূত এসবের কিছুই নই , মূলত ,আমার এই দৃশ্যমান নশ্বর জড় মাংসলদেহের ভেতরে অগোচরাবস্থায় থাকা শাশ্বত সনাতন শুদ্ধ চৈতন্য আত্মতত্বরূপী পরমাত্মা শিবই ( তুমিই ) , প্রকৃতপক্ষে আমি ।
না জ্ঞান প্রাণ নিঃশ্বাস নই পঞ্চবায়ু
না পঞ্চাবরণ কোশ ধাতু নই না আয়ু ।
নই পাদ পাণিপস্থ্ বচন না তো আমি
জড় এই দেহের শিব চেতনাত্মা তুমি ।।২।।
👉 আমি না তো জ্ঞান-শিক্ষা না তো আমি নিঃশ্বাস বা প্রশ্বাস আর না তো আমি কোনপ্রকার অপান-উপান-সোপান প্রাণ আদি পঞ্চবায়ু , না আমি রূপ-রস-রং-গন্ধ-গুণাদি পঞ্চাবরণ , না আমি অন্ননময়-প্রাণময়-মনোময়-বিজ্ঞানময়-আনন্দময় আদি পঞ্চকোষ আর না তো আমি কোনো শক্ত-তরল জাতীয় ধাতব পদার্থবস্তু । আমি প্রকৃতির নিয়মে সদা বাড়তে থাকা বা সীমিত হওয়া কারোর আয়ুই নই আর আমি বাক-পাণি-পদ-উপস্থ-পায়ু আদি পঞ্চকর্মেন্দ্রিয়ের কিছুই নই । মূলত ,আমার এই দৃশ্যমান নশ্বর জড় মাংসলদেহের ভেতরে অগোচরাবস্থায় থাকা শাশ্বত সনাতন শুদ্ধ চৈতন্য আত্মতত্বরূপী পরমাত্মা শিবই ( তুমিই ) , প্রকৃতপক্ষে আমি ।
না রাগ হিংসা মোহ নই আমি লোভ
নই মিথ্যা অহংকার ক্ষীণভাব ক্ষোভ ।
না ধর্মার্থকাম মোক্ষের আনন্দে ঝুমি
জড় এই দেহের শিব চেতনাত্মা তুমি ।।৩।।
👉 আমি রাগ-হিংসা-লোভ-মোহ আদি কোনো বিকার নই , আমি সর্বনাশী মিথ্যা অহংকার নই আমি নিঁচু মানসিকতা সম্পন্ন ক্ষীণভাবা কোনো ক্ষোভগ্রস্থও নই । আমি ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষাদি চার পুরুষার্থ প্রাপ্তির আনন্দের বশে নাচতে বা ঝুমতে থাকা কোনো জীব-ক্লীব এসমস্তের কিছুই নই । মূলত ,আমার এই দৃশ্যমান নশ্বর জড় মাংসলদেহের ভেতরে অগোচরাবস্থায় থাকা শাশ্বত সনাতন শুদ্ধ চৈতন্য আত্মতত্বরূপী পরমাত্মা শিবই ( তুমিই ) , প্রকৃতপক্ষে আমি ।
না পাপ পূণ্য কর্ম না সুখ দুঃখ ভয়
নই বেদ তীর্থ যজ্ঞ পূজার অভিপ্রায় ।
না ভোজন বা ভোজ্য নই ভোক্তা আমি
জড় এই দেহের শিব চেতনাত্মা তুমি ।।৪।।
👉 আমি পাপ-পূন্যাদি কর্মও নই আর না সেই কর্মের ফল , আর না আমার আছে সুখের আনন্দ-উল্লাস আর না দুঃখের ভয় । আমি বেদশাস্ত্র তীর্থ যজ্ঞ পূজাদি শ্রৌত কর্ম কোনো উদ্দেশ্য বা ইচ্ছে পূরণের আশায় করিও না , কারণ আমি তো কামনা আশা ইচ্ছাদি বিষয়-আশয় হতে ঊর্ধ্বস্থিত মুক্ত । না কেউ আমাকে ভোগ করে না কাউকে আমি ভোগ করি আর না তো কেউ আমার দ্বারা কাউকে ভোগ / প্রাপ্ত করে । মূলত ,আমার এই দৃশ্যমান নশ্বর জড় মাংসলদেহের ভেতরে অগোচরাবস্থায় থাকা শাশ্বত সনাতন শুদ্ধ চৈতন্য আত্মতত্বরূপী পরমাত্মা শিবই ( তুমিই ) , প্রকৃতপক্ষে আমি ।
না মৃত্যুর ভয় নেই জাতি বর্ণ আমার
পিতা মাতা নেই কেউ না জন্মাই বারম্বার ।
নই গুরুশিষ্য মিত্র না কাউকেই প্রণমি
জড় এই দেহের শিব চেতনাত্মা তুমি ।।৫।।
👉 আমার মৃত্যু বা কালের ভয়ও নেই , না আমার কোনো জাত-পাত বর্ণের ভেদ আছে , আমি এই সৃষ্টি চক্রের গোলকধাঁধায় ফেঁসে থাকা জীবেদের ন্যায় জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ হয়ে বারম্বার জন্মগ্রহণও করি না আর না মৃত্যুপ্রাপ্ত হই , আমার ওপর এসব কোনো প্রাকৃতিক নিয়মই খাটে না । না আমি কারোর গুরুশিষ্য আর না কেউ আমার গুরুশিষ্য , আমার কোনো শত্রু-মিত্রও নেই আর না আমি কাউকে আলিঙ্গন বা প্রণাম করি , কারণ , আমার এই দৃশ্যমান নশ্বর জড় মাংসলদেহের ভেতরে অগোচরাবস্থায় থাকা শাশ্বত সনাতন শুদ্ধ চৈতন্য আত্মতত্বরূপী পরমাত্মা শিবই ( তুমিই ) , প্রকৃতপক্ষে আমি ।
নিষ্কল অগম্য আমার দিব্য স্বরূপ
আমি ইন্দ্রিয়াতীত ব্যাপ্ত চরাচর সুরভূপ ।
নই বদ্ধ না মুক্ত এক শুদ্ধ সদা আমি
জড় এই দেহের শিব চেতনাত্মা তুমি ।।৬।।
👉 অদ্বিতীয় অখণ্ড সকলের অগম্য নির্গুণ এমনই আমার পরমদিব্য জ্যোতির্ময় স্বরূপ । আমার রূপ সকলের সমস্ত বোধ-বুদ্ধি জ্ঞান-কর্ম আদি ইন্দ্রিয়ের অতীত এবং আমি সমগ্র চর-অচর ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সর্বত্র বিরাজমান সকল মঙ্গলময় পরমদৈব সত্ত্বা বা তত্ত্বের অধিপতি । আমি কোনো মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ নই , তবুও আমি সমস্ত মায়ার ঊর্ধ্বে থাকা সকল বিকার হতে মুক্ত হয়েও এই মায়ার সংসারের প্রতিটা বিষয়বস্তুর মধ্যেই চির শুদ্ধ ভাবে মঙ্গলময় পরম দিব্যসত্ত্বা স্বরূপে অবস্থান করি , কারণ , আমিই সেই এক ও অদ্বিতীয় শাশ্বত সনাতন সদা শুদ্ধ চৈতন্য আত্মতত্বরূপী পরমাত্মা শিব , যিনি পঞ্চভূত দ্বারা তৈরি আমার এই দৃশ্যমান নশ্বর জড় মাংসলদেহের ভেতরে অগোচরাবস্থায় চৈতন্য চিদাত্মা রূপে সদা বিরাজিত একমাত্র পরমসত্য ।
ফলশ্রুতি
আমি বা তুমি লক্ষ চুরোয়াশি জীব
সবেতেই স্থিত এক পরমতত্ত্ব শিব ।
রচেন রুদ্রনাথ ইহা বেদসার বচন
সর্বজীবে শিবভাব অজ্ঞান মোচন ।।৭।।
👉 আমি তুমি বা ৮৪ লক্ষ যে জীব যোনি রয়েছে , সেই সকলের মধ্যে আত্মতত্ত্ব রূপে এক পরমসত্ত্বা শিবই স্থিত । এই জ্ঞান যা বেদের সার বচন তাকে জেনেই আমি শ্রী রুদ্রনাথ শৈব এই আত্মতত্ত্বময় স্তুতিটির রচনা করেছি । এই স্তুতির সারার্থ বুঝে যে "সকল জীবের মধ্যেই এক শিবই রয়েছেন দ্বিতীয় কিছু না" এই মূলতত্ত্বকে জীবনে উপলদ্ধ করতে সক্ষম হয় , তার সমস্ত অজ্ঞান নাশ হয় ।
লোভ দ্বেষ মিথ্যা অহংকার বর্জন
পঠিলে ভক্তিতে হয় আত্মজ্ঞানার্জন ।
যাহা সত্য তাহা শিব চিরোসুন্দরম
চিদানন্দময় সেই আমিই শিবহোহম ।।৮।।
👉কোনো মানুষ নিজের লোভ দ্বেষ হিংসা মিথ্যা অহংকারাদি বিকার ত্যাগ করে শ্রদ্ধাযুক্ত বিনম্র ভক্তিভাবে এই স্তুতির পড়লে নিশ্চিত ভাবেই সেই আত্মজ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হয় । যেমন ঈশ্বর সত্য , সেই সত্যই একমাত্র শিব আর এই শিব মূর্তিই অদ্বিতীয় চির সুন্দর । এরূপ সৎ চিৎ ও আনন্দ যুক্ত শিবই হলাম আমি ।
।। ইতি আত্মনির্বাণ ষষ্ঠক স্তুতি সম্পূর্ণ হোলো ।।
এই স্তোত্রটির বাংলা পদ্যাকার ভাষায়
অনুবাদক ও রচয়িতা :- শ্রীরুদ্রনাথ শৈব জী
©RudraNath_Shaiva
পোস্টটির কপিরাইট ও প্রচারে - শৈবসাহিত্য Blog
।। শ্রীগুরু দক্ষিণামূর্তয়ে নমঃ ।।
।। সদাশিবম ভজাম্যাহম ।।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন