শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬

শ্রীশ্রী বিদ্যা-সুধা-দাত্রী স্তুতি / Shree Shree Vidya-Sudha-Datri Stuti


২৩ শে জানুয়ারি , ২০২৬ 🚩

জয়তু মাতা সরস্বতী ভগবতী 🙏


🪔 শ্রীশ্রী বিদ্যা-সুধা-দাত্রী স্তুতি ( সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় পদ্যাকারে রচিত ) : -


( আজ বসন্তপঞ্চমীর পূণ্যতিথিতে ভগবতী সরস্বতীর প্রীত্যার্থে , সম্পূর্ণ নিজস্ব কবিশৈলীতার দ্বারা সম্পূর্ণ বাংলায় পদ্যাকার কাব্যিক ছন্দে আমার রচিত এই শ্রীশ্রী বিদ্যা-সুধা-দাত্রী স্তুতিটি আমার ব্লগে পোস্ট করলাম ; যারা সংস্কৃত হিন্দি আদি ভাষায় দেবী সরস্বতীর স্তোত্র পড়তে বুঝতে বা উচ্চারণে অসমর্থ , তাদের উদ্দেশ্যে । )

।। শ্রীশ্রী ভগবতী সরস্বতী মাতার নিকট প্রার্থনারত রুদ্রনাথ শৈবজী ।।


🚩 শ্রীশ্রী বিদ্যা-সুধা-দাত্রী স্তুতি ( সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় ) : -


( সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় পদ্যকার ও বঙ্গানুবাদ সহিত )


প্রথমপূজ্য গণেশায় নমো শঙ্কর-ভবানী ,

নমো নমো বাগদেবী জয় মা বীণাপাণি ।

শ্বেতশুভ্রা বাণীময়ী বেদা সর্বলোক মাতৃ ,

অজ্ঞান-তিমির নাশিনী বিদ্যা-সুধা দাত্রী ।।১।।

👉 প্রথম পূজিত গণেশকে প্রণাম , তারপর শিবপার্বতীকে প্রণাম । এরপর মা সরস্বতী তোমাকে বারবার নমস্কার - তুমি শ্বেতশুভ্রা , জ্ঞানময়ী , বেদরূপা , সকল জগতের মা । তুমি অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করে সকলকে বিদ্যার অমৃতজ্ঞান প্রদান করো , তোমায় প্রণাম । 


শিববাক্য সমুদ্ভবা ব্রহ্মনাদ-তরঙ্গ-রূপা ,

মন্ত্র-প্রসূতা শাস্ত্র-ধাত্রী সারদা সুরোভূপা ।

অক্ষরে অমৃত-ধারা ধ্বনি অনন্ত সাগর ,

তব কণ্ঠে মিথ্যা দলিত সত্যস্থিত আগর ।।২।।

👉 মা সরস্বতী ! তুমি শিবের বাক্য থেকে প্রকাশিত হয়েছ এবং ব্রহ্মনাদের তরঙ্গের মতো তুমি সকল মন্ত্র ও শাস্ত্রের উৎস । তোমার অক্ষর অমৃতের ধারা , ধ্বনি অনন্ত সাগরের মতো গভীর । তোমার কণ্ঠেই মিথ্যা নষ্ট হয় ও সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় । 


বীণার সুরে ব্রহ্মনাদ শান্তি-রসের গান ,

কৃপায় তব অন্তরে সদা জাগে শুদ্ধজ্ঞান ।

হংসবাহিনী বিবেকচিহ্ন সারাসার বিচারী ,

জ্ঞানদীপ জ্বালিয়ে ভক্তে দয়া করো ঈশ্বরী ।।৩।।

👉 মায়ের বীণার সুর সাক্ষাৎ ব্রহ্মনাদ ধ্বনির শান্তির গান , যা হৃদয়ে শুদ্ধ জ্ঞান চৈতন্য জাগায় । হংস তোমার বাহন - যা বিবেকের ঊর্ধ্বগমনের প্রতীক ও ভালো-মন্দ বিচার করতে শেখায় । তাই , মা তুমি আমার মতন অজ্ঞানী ভক্তের অন্তরে জ্ঞানদীপ জ্বালিয়ে দয়া করো । 


যে বিদ্যায় জন্মে অহং দিও না তা মোরে ,

তব কৃপা নম্রতারূপে দাও মা জীবন গড়ে ।

তুমি জপের অন্তর-শ্বাস ধ্যানের নীরবতা ,

তুমি তত্ত্বের গূঢ় অর্থ তুমিই মুক্তির শুদ্ধতা ।।৪।।

👉 দেবী ! যে বিদ্যা অহংকার বাড়ায় , সে বিদ্যা যেন আমি না পাই । মা যেনো তোমার কৃপায় আমি শান্ত শিষ্টাচার ও নম্রতাময় স্বভাবের হয়ে উঠি , যাতে আমার জীবন সুন্দর হয় । তুমিই জপের অন্তরশ্বাস , ধ্যানের নীরবতা , তত্ত্বের গভীর অর্থ এবং মুক্তির পবিত্র পথ । 


শিবে মতি হৃদয়ে জাগুক তব কৃপা-প্রভাবে ,

বাণী হোক নির্মলমতি প্রেম-সত্য-সুর স্বভাবে ।

রুদ্রনাথের প্রার্থনা মা দিও ওই চরণে ঠাঁই ,

শুদ্ধজ্ঞান লভে যেনো দেহান্তে কৈলাসে যাই ।।৫।।

👉 তোমার কৃপায় আমার হৃদয়ে শিবভক্তি জাগুক , বাণী হোক নির্মল , মনে থাকুক প্রেম ও সত্য । তাই , আমি রুদ্রনাথ প্রার্থনা করছি - মা গো ! তোমার চরণে আশ্রয় দাও , যাতে তোমার চরণ স্পর্শের কৃপায় শুদ্ধ মোক্ষদায়ক শিবজ্ঞান লাভ করে শেষে আমি কৈলাসে যেতে পারি । 



।। ইতি শ্রীশ্রী বিদ্যা-সুধা-দাত্রী স্তুতি সম্পূর্ণ হোলো ।।



এই স্তোত্রটির বাংলা পদ্যাকার ভাষায় 

অনুবাদক ও রচয়িতা :- শ্রীরুদ্রনাথ শৈব জী


©RudraNath_Shaiva


পোস্টটির কপিরাইট ও প্রচারে - শৈবসাহিত্য Blog 


।। শ্রীগুরু দক্ষিণামূর্তয়ে নমঃ ।।

।। ॐ ভগবতী সরস্বতৈ‌ নমো নমঃ ।।


শনিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২৫

শিবলিঙ্গ স্তুতি / Shivlinga Stuti


১৫ ই নভেম্বর , ২০২৫ 🚩

ॐ শিবলিঙ্গায় নমঃ 🙏


🪔শিবলিঙ্গ স্তুতি ( সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় পদ্যাকারে রচিত ) : -

( মূলত সংস্কৃতে রচিত লিঙ্গাষ্টকম স্তোত্রের অনুপ্রেরণায় বাংলার শিবভক্তদের কথা মাথায় রেখে ও তাদের পড়বার বোঝবার সুবিধার্থে এই শিবলিঙ্গ স্তুতি স্তোত্রটি প্রথম বাংলা ভাষায় পদ্যাকারে নিজের মতন করে নিজের ভাব ও কবিশৈলীর দক্ষতা অনুযায়ী অনুবাদ ও রচনা করলাম , যেহেতু বাংলার অনেক শিব ভক্তরা রয়েছেন যারা সংস্কৃত বা হিন্দি আদি ভাষায় রচিত বা লিখিত স্তব স্তোত্র বুঝতে বা পড়তে , উচ্চারণ করতে পারেন না , তাই মাতৃভাষা বাংলাতে তাদের ও সকল বঙ্গ সনাতনীদের পড়বার বোঝবার জন্যে সহজ সরল শব্দযোগে এটির রচনা । )


।। পরমেশ্বর সদশিবের নিরাকার ব্রহ্মবিগ্রহ শিবলিঙ্গ ।।


🚩শিবলিঙ্গ স্তুতি ( সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় ) : -


( সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় পদ্যকার ও বঙ্গানুবাদ সহিত )


বিষ্ণুবিধি আদি স্বর্গের দেবগণ 

করেন ব্রহ্ম হরলিঙ্গের পূজন ।

নাশে যাহা শোক জন্ম ও মরণ 

সেই শিবলিঙ্গে করি আমি নমণ ।।১।।

👉 বিষ্ণু-ব্রহ্মা আদি স্বর্গস্থিত দেবতারা সর্বদা নিরাকার ব্রহ্মস্বরূপ যেই লিঙ্গ বিগ্রহের পূজা করেন , যার পূজায় জীবের জন্ম-মৃত্যুর পুনরাবৃত্তির শোকচক্র বিনাশ হয় , সেই পরমব্রহ্ম স্বরূপ শিবলিঙ্গকে আমি প্রণাম করি ।

শ্রেষ্ঠ মুনি আদি বিপ্র ঋষিগণ

লিঙ্গপূজায় হয় ভব কামদহন ।

রাবণ অহং করেন যিনি দমন

সেই শিবলিঙ্গে করি আমি নমণ ।।২।।

👉 অগস্ত্য-দধীচি-বিশ্বামিত্র আদি শ্রেষ্ঠ ঋষি মুনিগণ ও ব্রহ্মজ্ঞানী কুলোত্তম ব্রাহ্মণেরা সদা যার পূজা করেন , যেই লিঙ্গ বিগ্রহের পূজায় সাংসারিক মায়া-মোহ-কাম-বাসনা আদি অজ্ঞান বিনষ্ট হয় , যিনি রাক্ষসরাজ রাবণের অহংকারকে চূর্ণ করেছিলেন , সেই পরমব্রহ্ম স্বরূপ শিবলিঙ্গকে আমি প্রণাম করি ।

পূজায় যাহার হয় বুদ্ধি বিবর্ধন 

যাহার করে দেবাসুর গুণকীর্তন ।

লেপিত যাহায় সুগন্ধাদি চন্দন

সেই শিবলিঙ্গে করি আমি নমণ ।।৩।।

👉 যাকে পূজা করলে সদজ্ঞান-সদবুদ্ধি বিবর্ধিত হয় ও অনেকাদি বিষয়ে সহজেই সিদ্ধিলাভ হয় , সকল দেবতা ও অসুরকুল একত্রে যার মহিমা-গুণগান কীর্তন করে থাকে , যার লিঙ্গ বিগ্রহে সর্বদা ভস্ম সুগন্ধি দ্রব্য মিশ্রণ ও চন্দন লেপিত থাকে , সেই পরমব্রহ্ম স্বরূপ শিবলিঙ্গকে আমি প্রণাম করি ।

নাগমাল বাসুকি যাহার গলভূষণ 

দক্ষ-যজ্ঞ করেছেন যিনি শোষণ ।

শোভে যাহাতে মনিমুক্তাদি রতন

সেই শিবলিঙ্গে করি আমি নমণ ।।৪।।

👉 নাগরাজ বাসুকি যার বিগ্রহকে গলভূষণ রূপে মালার ন্যায় আবৃত করে রয়েছে , যিনি দাম্ভিক প্রজাপতি দক্ষের যজ্ঞানুষ্ঠানকে প্রচণ্ড ভাবে শোষণ ( ভয়ানক ভাবে বিধ্বংস ) করেছিলেন , যার বিগ্রহে মহামূল্যবান মনি-মুক্তা আদি রত্ন পাথরে সুসজ্জিত , সেই পরমব্রহ্ম স্বরূপ শিবলিঙ্গকে আমি প্রণাম করি ।

স্নানাভিষেকে পঞ্চামৃত ও চন্দন 

শতজন্মের পাপ করে যিনি খণ্ডন ।

সুরলোক পুষ্পে শোভিত রত্নাসন

সেই শিবলিঙ্গে করি আমি নমণ ।।৫।।

👉 পঞ্চামৃত-চন্দন-সুগন্ধ-গঙ্গাজল আদি ষোড়শোপচার দ্বারা যার নিত্য অভিষেক করা হয় , যিনি জীবের শতশত জন্মের সঞ্চিত পাপকর্মের কর্মফলকে নির্মূল করে দেন , যার অধিষ্ঠানের আসন মণিরত্ন ও পারিজাত-মন্দার-কর্ণিকা-কল্পবর্ষা-মঞ্জরিকামিকাদি স্বর্গীয় পুষ্প দ্বারা সর্বদা সুবাসিত এবং সুসজ্জিত , সেই পরমব্রহ্ম স্বরূপ শিবলিঙ্গকে আমি প্রণাম করি ।

কৃষ্ণ রাম আদি অবতারে নারায়ণ

করেন ভক্তিভাবে যাহার অর্চন ।

যাহার প্রভাজ্যোতি সমকোটি তপন 

সেই শিবলিঙ্গে করি আমি নমণ ।।৬।।

👉 পরশুরাম , রামচন্দ্র ও শ্রীকৃষ্ণাদি ভগবান নারায়ণের শ্রেষ্ঠ অবতারগণেরা তাদের অবতারলীলায় নিত্য যার জপ-পূজার্চনা করেছেন , যার তেজোজ্যোতি কোটিকোটি সূর্যের প্রকাশ সমান , সেই পরমব্রহ্ম স্বরূপ শিবলিঙ্গকে আমি প্রণাম করি ।

চরাচর সৃজন লয়ের যিনি কারণ 

করেন বিকার মোহ অজ্ঞান তারণ ।

স্মরণ মাত্রে কলিকালপীড়া শমন 

সেই শিবলিঙ্গে করি আমি নমণ ।।৭।।

👉 যিনি চরাচর ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির মূলকারণ ও অন্তিমে যার মধ্যেই সকল কিছু লীন ( লয় ) হয় বলেই যাকে লিঙ্গ বলা হয় , যার পূজায় মদ-মোহ-অহংকারাদি অজ্ঞানরূপী বিকার জীবের চেতনা থেকে বিতাড়িত হয় , যাকে স্মরণ বা মনে মনে চিন্তন মাত্রেই কলিকালরূপী মহাব্যাধির কষ্ট-পীড়া নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় , সেই পরমব্রহ্ম স্বরূপ শিবলিঙ্গকে আমি প্রণাম করি ।

দেবগণগুরু সহ ঋষি ভৃগুনন্দন

করেন যাহার সদা শ্রীচরণ বন্দন ।

পরমসত্য যিনি গুণাতীত সনাতন 

সেই শিবলিঙ্গে করি আমি নমণ ।।৮।।

👉 সমস্ত দেবগণের গুরু বৃহস্পতি ও ঋষি ভৃগুর পুত্র অসুরগুরু শুক্রাচার্য্য সর্বদা যার চরণযুগলের পূজা-বন্দনা করে থাকেন , যিনি শাশ্বত-পরমসত্য-বিভু পরমতত্ত্ব-সনাতন ও সকল গুণের আধার , সেই পরমব্রহ্ম স্বরূপ শিবলিঙ্গকে আমি প্রণাম করি ।


ফলশ্রুতি :-


বত্রিশ সনের অগ্রহায়ণ মাসে 

রুদ্রনাথ রচে গৃহ শিবালয়ে বসে ।

পূজাকালে বা ভক্তিযুত ভাবে 

পঠিলে শিবলোক নিশ্চিত যাবে ।।৯।।

👉 বাংলা সন ১৪৩২ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাসে আমি রুদ্রনাথ শৈব আমার গৃহ শিবমন্দির প্রাঙ্গণে বসে এই শিবলিঙ্গ স্তুতিটির রচনা করেছি । এই স্তুতিটিকে যদি কেউ শিবপূজার সময় বা অন্যত্র যেকোনো স্থানে অবস্থান কালে ভক্তিভাবে পাঠ করে থাকে , তবে সেই পূন্যাত্মা ভক্ত অবশ্যই শিবলোকে যাবে এবং শিবের সান্নিধ্য-স্নেহ লাভ করবে ।



।। ইতি শিবলিঙ্গ স্তুতি সম্পূর্ণ হোলো ।।



এই স্তোত্রটির বাংলা পদ্যাকার ভাষায় 

অনুবাদক ও রচয়িতা :- শ্রীরুদ্রনাথ শৈব জী


©RudraNath_Shaiva


পোস্টটির কপিরাইট ও প্রচারে - শৈবসাহিত্য Blog 


।। শ্রীগুরু দক্ষিণামূর্তয়ে নমঃ ।।

।। সদাশিবম ভজাম্যাহম ।।


মঙ্গলবার, ৮ জুলাই, ২০২৫

শ্রীভৈরব করুণার্ঘ্যাষ্টক স্তব / Shri Bhairav Karunarghya Stava


৮ই জুলাই , ২০২৫ 

ॐ ভাম ভৈরবায় নমঃ 🚩


🚩 শ্রীভৈরব করুণার্ঘ্যাষ্টক স্তব ( সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় পদ্যাকারে রচিত ) : - 

( মূলত সংস্কৃতে রচিত ভৈরব তাণ্ডব স্তোত্র নামক একটি স্তুতির সুন্দর শব্দছন্দের অনুপ্রেরণায় বাংলার শিবভক্তদের কথা মাথায় রেখে ও তাদের পড়বার, বোঝবার সুবিধার্থে এই শ্রীভৈরব করুণার্ঘ্যাষ্টক  স্তব নামে স্তোত্রটি প্রথম বাংলা ভাষায় পদ্যাকারে নিজের মতন করে নিজের ভাব ও কবিশৈলীর দক্ষতা অনুযায়ী অনুবাদ ও রচনা করলাম , যেহেতু বাংলার অনেক শিব ভক্তরা রয়েছেন যারা সংস্কৃত বা হিন্দি আদি ভাষায় রচিত বা লিখিত স্তব স্তোত্র বুঝতে বা পড়তে , উচ্চারণ করতে পারেন না , তাই মাতৃভাষা বাংলাতে তাদের ও সকল বঙ্গ সনাতনীদের পড়বার বোঝবার জন্যে সহজ সরল শব্দযোগে এটির রচনা । )

শাস্ত্রে এই স্তোত্রটির সৃষ্টির প্রেক্ষাপট কাহিনী অনুযায়ী , সৃষ্টির প্রারম্ভের সময়কালে একদা ভগবান ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর মধ্যে নিজ নিজ শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদনের এক বিরাট দ্বন্দ্ব যুদ্ধ শুরু হয় যা ক্রমশ সৃষ্টি বিধ্বংসকারী রনভূমিতে পরিণত হয় । এমতাবস্থায় ইন্দ্রাদি দেবতা ঋষি মুনি সকলেই সৃষ্টির রক্ষার্থে ও ব্রহ্মা বিষ্ণুকে রুখতে কৈলাসে ভগবান শিবের শরণাপন্ন হোলে , ভগবান শিব দেবতাদের আর্তি শুনে জগত রক্ষার্থে ব্রহ্মা বিষ্ণুর মধ্যে তৎক্ষণাৎ অনাদি অনন্ত স্বরূপে অগ্নিলিঙ্গ শরীর ধারণ করে স্থিত হন । সেই লিঙ্গমূর্তির একসহস্র দিব্যবর্ষেও অন্ত না পাওয়ায় বিষ্ণুর শ্রেষ্ঠত্বের অভিমান তৎক্ষণাৎ চূর্ণ হোলেও ব্রহ্মা একাদশ সহস্র দিব্যবর্ষ আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান সেই লিঙ্গের আদি খুঁজতে , অন্তিমে নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের লালসায় ভগবান ব্রহ্মা কেতকী পুষ্প ও গোমাতার মিথ্যা সাক্ষী এনে সেই লিঙ্গমূর্তি ও ভগবান বিষ্ণুর সম্মুখে স্থিত করেন এবং নিজেকেই বিষ্ণু তথা সেই লিঙ্গমূর্তি হতেও শ্রেষ্ঠ , অহংকারে এমন মিথ্যা বাদন করতে থাকেন । তৎক্ষণাৎ চতুর্মুখী ব্রহ্মার অহংকার থেকে উর্দ্ধমুখী দিকে সৃষ্টি হোলো পঞ্চমমস্তক যাতে ব্রহ্মার অহংকার দ্বেষ মিথ্যা ভাষণ অধিক মাত্রায় বেড়ে গেলো । সেই অসহনীয় দাম্ভিকতা দেখে লিঙ্গমূর্তি হতে ভগবান শিব পুনরায় নিজের সাকার রূপ ধারণ করলেন ও ব্রহ্মার অহংকার বিনাশ করতেই নিজের অন্তঃশক্তি হতে বিভৎস বিকট স্বরূপ কালভৈরবকে প্রকট করলেন । প্রকট হওয়া মাত্রই কালভৈরবের প্রথম হুংকারে ব্রহ্মা বিষ্ণুর সকল অজ্ঞানতা , অহংকার বিনাশ হয়ে যায় , দ্বিতীয় হুংকারে ভগবান বিষ্ণু ব্রহ্মা ভয়ে প্রায় মূর্ছিতবস্থায় চলে যান , এরপর ভগবান কালভৈরব নিজের বাম পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলির নখ ভেঙ্গে ( কোনো কল্পের কাহিনী তে ডান হাতের ধারালো নখের অগ্রভাগ দিয়েই ) একটি অশি সমান ধারালো অস্ত্র রূপেই ব্যবহার করে ব্রহ্মার পঞ্চম মস্তককে ছিঁড়ে / কেটে ফেলেন । এরপর ব্রহ্মা বিষ্ণু আদি দেবতাগণ কালভৈরবের বিকরাল রৌদ্ররূপকে শান্ত করতেই হাত জোড়ে ভৈরব শিবের স্তুতি করতে শুরু করেন এবং সেই স্তুতিতে ভগবান কালভৈরব সন্তুষ্ট হন এবং সেই ছন্দের তালে নৃত্য ( তাণ্ডব ) করেন ও সকল দেবতা ও সৃষ্টিকে নানাবিধ আশীর্বাদ প্রদান । সেই স্তুতিই  ভৈরব তাণ্ডব স্তোত্র নামে সংসারে বিখ্যাত হয় এবং সেই স্তুতিরই অনুপ্রেরণায় নিজের ভক্তিভাব জ্ঞান ও পদ্যাকার কাব্যিক শৈলীকতার সামর্থ্য অনুযায়ী নিজ মাতৃভাষা বাংলায় সহজ করে শ্রীভৈরব করুণার্ঘ্যাষ্টক স্তব টি রচনা করেছি ।

।। পদ্মকল্পোক্তকালে ব্রহ্মোকপালধারী কালাধিরাজ ভগবান কালভৈরব ।। 




🚩 শ্রীভৈরব করুণার্ঘ্যাষ্টক স্তব ( সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় ) : - 


( সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় পদ্যকার ও বঙ্গানুবাদ সহিত )



প্রভু উগ্রপ্রচণ্ড ধরে পাশ-দণ্ড করো রিপুখণ্ড হে সুখোকারী 

ভক্তহিত কারক বৈরীবরারক দন্ত ভয়াল বিভো নৃত্যকারী ।

শঙ্খধ্বনি ডমরু পায়ের ওই ঘুমরু স্মিত মুখপদ্ম হাস্যকারী 

ভৈরব ভূতনাথ শিব হইতে প্রকট করো কৃপা জয় কষ্টহারী ।।১।।

👉 যিনি ভীষণ উগ্র রৌদ্র স্বভাবের , হাতে পাশ দণ্ড ধারণ করে সকল রিপু বা বিকারসমূহের বিনাশ করে সুখ প্রদান করেন । যিনি ভক্তের মঙ্গলকরী তথা সকল শত্রু আদি অশুভ শক্তির বিনাশক যার দাঁতসমূহ ভীষণ তীক্ষ্ম ভয়ংকর এবং যিনি সকলের শ্রেষ্ঠ বিভু । শঙ্খের ধ্বনি ডমরুর নাদ ও পায়ে বাধা ঘুঙুর এর শব্দের ছন্দতালে তাল মিলিয়ে সর্বদা তাণ্ডব নৃত্যেরত যার স্মিত হাস্যবদন সদা ভক্তগণের মনে ও সমগ্র সংসারকে এক আলাদাই প্রশান্তি প্রদান করে , সেই ভূতের নাথ বাবা ভৈরব যিনি সকলের দুঃখ কষ্ট হরণ করতেই শিব হতে প্রকট হয়েছেন , তিনি আমায় কৃপা করুক ।

সিঁদুরলালে রঞ্জিত শত্রু সুভঞ্জিত রণভূমিতে ভীম দেহধারী

হাতে ব্রহ্মোকপাল পদঝঙ্কারতাল শুদ্ধকরে সবে ত্রিশুলধারী ।

মোক্ষের পথবন্ধু হে করুণা সিন্ধু দেবেশ্বর পাপ হরণকারী 

ভৈরব ভূতনাথ শিব হইতে প্রকট করো কৃপা জয় কষ্টহারী ।।২।।

👉যুদ্ধভূমিতে বিশালাকায় বিরাট দেহধারণ করে শত্রুদলকে যিনি দক্ষতার সাথে বিনাশ করেন এবং সেই শত্রুদিগের রক্তলালে যার সম্পূর্ণদেহ রঙে সিঁদুরলাল বর্ণের বলে মনে হয় , যিনি হাতে ব্রহ্মার পঞ্চম মস্তকটি তার ভিক্ষাপাত্র বা কপালপাত্র রূপে ধারণ করে আছেন এবং যার আনন্দ নৃত্যের সময় তার পায়ের নূপুর হতে নির্গত শব্দ জগতকে সর্বদা পবিত্র করতে থাকে , তিনিই সকল দেবের অধীশ্বর যিনি তার হাতে থাকা ত্রিশূল দ্বারা সকলের পাপ অহংকার আদি বিকার হরণ বা নাশ করেন তথা যিনি করুণার পরমস্রোত ও মোক্ষপ্রার্থীদের পথের বন্ধু রূপে একমাত্র মার্গদর্শক , সেই ভূতের নাথ বাবা ভৈরব যিনি সকলের দুঃখ কষ্ট হরণ করতেই শিব হতে প্রকট হয়েছেন , তিনি আমায় কৃপা করুক ।

কলি সুবিনাশক কামোপরিশাসক কণ্ঠদেশে নাগ মাল্যধারী

পরিজনসাধু নায়ক শুদ্ধতাদায়ক নেত্রত্রয়ে কলুষতাহারী ।

বেশভূষা বিরূপ বিকরাল স্বরূপ পবিত্র দিব্য ত্রয়ী গুণধারী 

ভৈরব ভূতনাথ শিব হইতে প্রকট করো কৃপা জয় কষ্টহারী ।।৩।।

👉 যিনি কলিকালের অরাজকতা অজ্ঞানতা আদি অধর্মের অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিনাশকারী এবং যিনি সকলকে নিজের বশে নাচানো কামদেবের উপরেই নিজের শাসন জমিয়েছেন এবং সকল কামনা হতে উর্দ্ধে নিজের অবস্থানকেই বোঝাতে যিনি গলায় নাগরাজ বাসুকীকে মালারূপে ধারণ করেছেন যা মূলত তার কুণ্ডলিনী শক্তির সদা জাগরণের প্রতীক । যিনি সাধু সন্ত পরিজনদের ইষ্ট তথা নায়ক , যিনি ত্রিনেত্র অগ্নি দ্বারা সকলের মনের কলুষতা কে বিনাশ করেন ও তাদের শুদ্ধতা প্রদান করেন । যার বেশভূষা সকলের থেকে আলাদা অশুদ্ধ প্রকৃতির এবং রূপ তো তার থেকেও বিকট ভয়ানক , তবুও যিনি বিশুদ্ধতা পবিত্রতার পরাকাষ্ঠা ও সত্ব রজঃ তম ত্রিগুণাদি সকল দিব্যগুণকে ধারণ করেন , সেই ভূতের নাথ বাবা ভৈরব যিনি সকলের দুঃখ কষ্ট হরণ করতেই শিব হতে প্রকট হয়েছেন , তিনি আমায় কৃপা করুক ।

অভেদ্য ত্রিশূল আশ্রয়ে জীবকূল পিণাকপাণি শিব ত্রিপুরারী 

ভুতদেবাদীবেষ্টিত শান্ত অধিষ্ঠিত প্রসন্ন বদন মনোমুগ্ধকারী । 

ভক্তজন প্রীত দেহতনু অতীত হে দুঃখ বিনাশক প্রলয়কারী 

ভৈরব ভূতনাথ শিব হইতে প্রকট করো কৃপা জয় কষ্টহারী ।।৪।।

👉 যার হাতে থাকা ত্রিশূল সকলের দ্বারা অভেদ্য অজেয় , যার শরণে সমস্ত জীব জগৎ আশ্রিত , যিনি পিণাক নামক ধনুক হাতে ধারণ করে সর্বপ্রথম সমগ্র জগতকে ধনুর্বিদ্যার জ্ঞান দিয়েছেন সেই শিব যিনি তারকাক্ষ , কমলাক্ষ ও বিদ্যুন্মালি নামক তিন অজেয় ত্রিপুররাজ্যের অসুর ভ্রাতাদের একটিমাত্র বাণ দ্বারা বধ করেছিলেন , সেই ত্রিপুরারী কৈলাসে প্রসন্নকান্তি বদনে শান্ত সৌম্যভাবে অধিষ্ঠিত হয়ে বসে থাকেন এবং একদিকে সকলের ত্যাজ্য ভূত প্রেত পিশাচ সমূহ অন্যদিকে জগতের পূজ্য বরিষ্ঠ দেবতাসকল তার প্রমথগণ হয়ে তাকে সর্বদা চারিদিক থেকে বেষ্টন করে রাখেন , অমঙ্গল-মঙ্গল নিকৃষ্ট-শ্রেষ্ঠ তথা ত্যাজ্য-পূজ্য সকলের সব ভেদাভেদ ভুলে একইসাথে এভাবে একই স্থানে কোনো একের সম্মুখে ভক্তিভাবে উপস্থিতির দৃশ্য মনকে আশ্চর্য তথা মুগ্ধ দুইই করে । যিনি ভক্তজনের প্রীতিভাজক , যিনি দেহ তনু মনের অতীত অগম্য , সকলের দুঃখ বিনাশকারী প্রলয়কালে ভয়ংকর ধ্বংসকর্তা , সেই ভূতের নাথ বাবা ভৈরব যিনি সকলের দুঃখ কষ্ট হরণ করতেই শিব হতে প্রকট হয়েছেন , তিনি আমায় কৃপা করুক ।

মুখপঙ্কজ বিমল শশিকলা নির্মল শ্রেষ্ঠ সকলকলা জ্ঞানধারী 

লোকো হিতকারক ভয়শোকতারক জীবে সদা সুপুষ্টিকারী ।

বরদাভয় দাতা হে ভাগ্য বিধাতা বিপদ বিতাড়ক  হিতকারী 

ভৈরব ভূতনাথ শিব হইতে প্রকট করো কৃপা জয় কষ্টহারী ।।৫।।

👉 যার মুখমণ্ডল সদ্যোজাত শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ কোমল , মাথায় নির্মল বাঁকা অর্ধ্বচন্দ্রের টুকরো শোভায়মান এবং যিনি সমস্ত জ্ঞান গুণ কলার ধারক বাহক ও প্রকাশক সকলের শ্রেষ্ঠ , যিনি সর্বদা চতুর্দশ ভুবন তথা ত্রিলোকের হিত সাধক , সকলের ভয় শোক নাশকারী ও সমস্ত জীবের সুস্বাস্থ্য সুআয়ু নিরোগ আদি পুষ্টি প্রদানকারী । যিনি সকলের ভাগ্যলেখক বিধাতা , সকলকে পালনকারী ধাতা , সমস্ত বিপদ বিনাশ করে বর অভয় প্রদানকারী দাতা ও অন্তিমকালে জীবের মুক্তির মার্গ প্রশস্থ করে হিতসাধনকারী ত্রাতা , সেই ভূতের নাথ বাবা ভৈরব যিনি সকলের দুঃখ কষ্ট হরণ করতেই শিব হতে প্রকট হয়েছেন , তিনি আমায় কৃপা করুক ।

সজ্জিত হাতে অস্ত্র দিক সব বস্ত্র দোষগুণ বর্জিত জটাধারী 

সিদ্ধ করো কার্য শরণে সব আর্য সময় নিয়ন্ত্রক মদনারী ।

বিভূতি ললাটে কাল পাশ কাটে ধর্মাত্মাগণে সদা রক্ষাকারী 

ভৈরব ভূতনাথ শিব হইতে প্রকট করো কৃপা জয় কষ্টহারী ।।৬।।

👉 যার হাত নানাবিধ অস্ত্রশস্ত্র দ্বারা সদা সুশোভিত , দশ দিক যার বস্ত্র , যিনি সকল দোষ গুণ অশুদ্ধতা পবিত্রা হতে মুক্ত ও যিনি জটা ধারণ করেন মস্তকে , মহাজ্ঞানী প্রতাপী আর্যগনেরা যার শরণ নেওয়া মাত্রই তাদের বিফলিত হওয়া কার্যও সিদ্ধ / সফল হয়ে যায় , যিনি সময় কালের নিয়ন্ত্রক ও মদনদেবের বিনাশকারী , সেই ভূতের নাথ বাবা ভৈরব যিনি সকলের দুঃখ কষ্ট হরণ করতেই শিব হতে প্রকট হয়েছেন , তিনি আমায় কৃপা করুক ।

বেদবিজ্ঞান সার চিন্তনে ভবপার সদজ্ঞান প্রদায়ক শুদ্ধবারি 

কি শুভ্র বা পীত সব গুণরহিত সুরমুনিজন সদা মনোহারী ।

ভ্রুনেত্র কুটিল জটাজাল জটিল বিষয় বিমুখ যিনি সংসারী 

ভৈরব ভূতনাথ শিব হইতে প্রকট করো কৃপা জয় কষ্টহারী ।।৭।।

👉 যিনি জ্ঞান বিজ্ঞান বেদ আগম শাস্ত্রের অবর্ণনীয় সারতত্ত্ব , যার চিন্তন মাত্রেই জীব ভব সংসার হতে পার হয়ে যায় , যিনি সকলের অজ্ঞান নাশ করে সদজ্ঞান প্রদানকারী তথা যিনি গঙ্গার জলের সমান পরমশুদ্ধ । যার দিব্যদেহ শ্বেত হলুদ নীল লাল আদি সমস্ত বর্ণগুণের অতীত স্বরূপ দেবতা সুধী মুনি ভক্তজনদের সদা মন চিত্তকে আপ্লুত মুগ্ধ করে , যার ভ্রু কোচকানো বিরূপ চোখগুলি দেখলেই ভয় লাগে , যার জটা ভীষণ ঘনকেশ ও জটিল এবং যিনি দেবী পার্বতী স্বরূপা স্ত্রীর স্বামী ও কার্তিক গনেশ দুই পুত্রের পিতা রূপে সংসারী হয়েও সাংসারিক বিষয় আশয় কামনা বাসনা চাওয়া পাওয়ার প্রতি অনাসক্ত , সেই ভূতের নাথ বাবা ভৈরব যিনি সকলের দুঃখ কষ্ট হরণ করতেই শিব হতে প্রকট হয়েছেন , তিনি আমায় কৃপা করুক ।

বেদশাস্ত্রে পরম পাপনাশে চরম জগদাখিল স্বামীন দর্পহারী 

শরণাগত রক্ষক অজ্ঞান ভক্ষক ভক্তেকনাথ শমনান্তকারী ।

পদ্মত্রয় লোচন ভবপাশমোচন শোভিতা বামে উমা অর্ধনারী 

ভৈরব ভূতনাথ শিব হইতে প্রকট করো কৃপা জয় কষ্টহারী ।।৮।।

👉 বেদাদি শাস্ত্রে যিনি পরমসত্য রূপে ধার্য হয়েছেন , যিনি চরম থেকে চরমতম পাপকেও বিনাশ করতে সক্ষম , যিনি সমস্ত জগদ সংসারের একমাত্র প্রভু ও সকলের দর্প চূর্ণবিচূর্ণ করেন , যিনি সকলের অজ্ঞানকে ভক্ষণ করেন তথা শরণাগত জীবের যিনি রক্ষা করেন , সেই ভক্তের নাথ যিনি শমনরূপী যমরাজেরও অন্তকারী । যার তিনটি নেত্র পদ্মের ন্যায় সুন্দর , যিনি ভব-সংসারের সকল মায়াপাশ মোচন করেন , যার বাম অঙ্গে ভগবতী উমা সদা বিরাজিতা , যিনি নারী শক্তিকে সম্মান প্রদর্শন করতেই নিজের অর্ধ অঙ্গে ভগবতীকে স্থান দিয়ে অর্ধনারীশ্বর নামে পরিচয় পেয়েছেন , সেই ভূতের নাথ বাবা ভৈরব যিনি সকলের দুঃখ কষ্ট হরণ করতেই শিব হতে প্রকট হয়েছেন , তিনি আমায় কৃপা করুক ।

ভক্তিভব বশে শয়ন একাদশে রুদ্রনাথ রচেন এ স্তুতি ভারী 

দিয়ে সুন্দর সুতাল বাজিয়ে গাল শিব সম্মুখে বসে গীতকারী ।

হবেই সে সুখী সদজ্ঞান মুখী পাবে সঙ্গিনী সতী লক্ষ্মী নারী 

সেই মহাধনবান ভক্ত মহান যদি কৃপা করেন শিব শুভ কারী ।।৯।।

👉 ভক্তির বশে দেবশয়নী একাদশীর পূণ্যদিনে রুদ্রনাথ এই ভারী ( কঠিন ) স্তুতিটির রচনা করেছেন । শিবের সম্মুখে বসে ভক্তিভাবে যে কেউ ছন্দ তাল সুর মিলিয়ে গাল বাজিয়ে এই স্তুতি গায়ন করবে , সে সংসারে পরমসুখী ও সত্য ব্রহ্মজ্ঞান মার্গী হবে এবং তার সঙ্গে সেই পুণ্যবান গৃহীজীবনে সঙ্গিনী রূপে একজন শান্ত সংসারী লক্ষ্মী সতী স্ত্রীকে পাবে । যদি সকলের মঙ্গলকারী ভগবান শিব কাউকে কৃপা করেন তবেই সংসারে এই সমস্ত কিছুই লাভ করতে কেউ সক্ষম হয় এবং প্রকৃতপক্ষেই সংসারে সে মহাভাগ্য ও ধনবান এর সাথে সাথে মহান ভক্ত রূপেও গণ্য হয় । 



।। ইতি শ্রীভৈরব করুণার্ঘ্যাষ্টক স্তব সম্পূর্ণ হোলো ।।


এই স্তোত্রটির বাংলা পদ্যাকার ভাষায় 

অনুবাদক ও রচয়িতা :- শ্রীরুদ্রনাথ শৈব জী


©RudraNath_Shaiva


পোস্টটির কপিরাইট ও প্রচারে - শৈবসাহিত্য Blog 


।। শ্রীগুরু দক্ষিণামূর্তয়ে নমঃ ।।

।। সদাশিবম ভজাম্যাহম ।।

বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন, ২০২৫

আত্মনির্বাণ ষষ্ঠক স্তুতি / Atmanirvan Shasthak Stuti


২৬ শে জুন , ২০২৫ 

শ্রীমন্মহাদেবায় নমঃ শিবায় 🚩


🚩 আত্মনির্বাণ ষষ্ঠক স্তুতি ( সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় পদ্যাকারে রচিত ) :-

 ( মূল সংস্কৃতে রচিত নির্বাণ ষঠকম স্তোত্র , যা মূলত স্মার্ত মতাদর্শনের প্রণেতা আচার্য শঙ্করের আত্মবোধ হতে রচিত । 

আচার্য শঙ্কর একজন শৈবদর্শন-পরম্পরার ঘোর বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও , "আমি কে ? পরম সত্য কি ? সবার মধ্যস্থিত মূল আত্মতত্ব কে ?" এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই তিনি বেদসার শৈবমতদর্শনের চূড়ান্ত মহাবাক্য যা উপনিষদ দ্বারাও প্রতিপাদিত , সেই "অহম ব্রহ্মস্মি" , "তত্বমসি ব্রহ্ম" বা "অহম রুদ্রের্ভি" বা "অহম শিবম শিবশ্চহম তঞ্চপি শিবমেব চ" অর্থাৎ , 'আমিই ব্রহ্ম , তুমিও সেই ব্রহ্ম , আমিই সেই রুদ্র বা আমি শিব সেই শিবই আমি ও তুমি সেই সাথে সমস্ত কিছুই শিব'  এই বাক্যকেই তিনি পরম রূপে উপলব্ধি করেন এবং শৈবদর্শন বিরোধী হয়েও পরোক্ষভাবে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি শিবাদ্বৈত শৈবদর্শনের এই সারবাক্য - "আমি তুমি আদি এ সমস্ত সৃষ্টিই সেই ব্রহ্ম আর সেই অদ্বিতীয় ব্রহ্মই শিব"-কেই স্বীকার করে , নির্বাণষঠকম স্তোত্র টির রচনা করেন যেখানে তার স্তুতির মূলবাক্য ছিলো - "চিদানন্দরূপঃ শিবহোহম শিবহোহম" । 

এই অত্যন্ত শ্রুতিমধুর ও তাত্ত্বিক সংস্কৃত ভাষার স্তোত্রটির অনুপ্রেরণায় আমি , বাংলার শিবভক্তদের কথা মাথায় রেখে ও তাদের পড়বার, বোঝবার সুবিধার্থে স্তোত্রটি এই আত্মনির্বাণ ষষ্ঠক স্তুতি নামে প্রথম বাংলা ভাষায় পদ্যাকারে নিজের মতন করে নিজের ভাব ও কবিশৈলীর দক্ষতা অনুযায়ী অনুবাদ ও রচনা করলাম , যেহেতু বাংলার অনেক শিব ভক্তরা রয়েছেন যারা সংস্কৃত বা হিন্দি আদি ভাষায় রচিত বা লিখিত স্তব স্তোত্র বুঝতে বা পড়তে , উচ্চারণ করতে পারেন না , তাই মাতৃভাষা বাংলাতে তাদের ও সকল বঙ্গ সনাতনীদের পড়বার বোঝবার জন্যে সহজ সরল শব্দযোগে এটির রচনা । )



।। সকলের আত্মস্থিত পরমতত্ব সচ্চিদানন্দ পরমাত্মা ভগবান রুদ্র ।।


🚩আত্মনির্বাণ ষষ্ঠক স্তুতি ( সম্পূর্ণ বাংলায় ) :-


( সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় পদ্যকার ও বঙ্গানুবাদ সহিত )


মন বুদ্ধি চিত্ত না আমি অহংকার 

না চক্ষু নাসিকা না সুস্বাদ জিহ্বার ।

না জল বায়ু অগ্নি নই আকাশ ভূমি

জড় এই দেহের শিব চেতনাত্মা তুমি ।।১।।

👉 আমি না তো মন বুদ্ধি বা চিত্ত না তো অহংকার , না চোখ মুখ নাক আর না তো আমি জিভের দ্বারা গ্রহণ করা কোনরকম স্বাদ । আমি জল বায়ু অগ্নি মহাকাশ ও পৃথিবী আদি পঞ্চভূত এসবের কিছুই নই , মূলত ,আমার এই দৃশ্যমান নশ্বর জড় মাংসলদেহের ভেতরে অগোচরাবস্থায় থাকা শাশ্বত সনাতন শুদ্ধ চৈতন্য আত্মতত্বরূপী পরমাত্মা শিবই ( তুমিই ) , প্রকৃতপক্ষে আমি ।

না জ্ঞান প্রাণ নিঃশ্বাস নই পঞ্চবায়ু 

না পঞ্চাবরণ কোশ ধাতু নই না আয়ু ।

নই পাদ পাণিপস্থ্ বচন না তো আমি

জড় এই দেহের শিব চেতনাত্মা তুমি ।।২।।

👉 আমি না তো জ্ঞান-শিক্ষা না তো আমি নিঃশ্বাস বা প্রশ্বাস আর না তো আমি কোনপ্রকার অপান-উপান-সোপান প্রাণ আদি পঞ্চবায়ু , না আমি রূপ-রস-রং-গন্ধ-গুণাদি পঞ্চাবরণ , না আমি অন্ননময়-প্রাণময়-মনোময়-বিজ্ঞানময়-আনন্দময় আদি পঞ্চকোষ আর না তো আমি কোনো শক্ত-তরল জাতীয় ধাতব পদার্থবস্তু । আমি প্রকৃতির নিয়মে সদা বাড়তে থাকা বা সীমিত হওয়া কারোর আয়ুই নই আর আমি বাক-পাণি-পদ-উপস্থ-পায়ু আদি পঞ্চকর্মেন্দ্রিয়ের কিছুই নই । মূলত ,আমার এই দৃশ্যমান নশ্বর জড় মাংসলদেহের ভেতরে অগোচরাবস্থায় থাকা শাশ্বত সনাতন শুদ্ধ চৈতন্য আত্মতত্বরূপী পরমাত্মা শিবই ( তুমিই ) , প্রকৃতপক্ষে আমি ।

না রাগ হিংসা মোহ নই আমি লোভ 

নই মিথ্যা অহংকার ক্ষীণভাব ক্ষোভ ।

না ধর্মার্থকাম মোক্ষের আনন্দে ঝুমি

জড় এই দেহের শিব চেতনাত্মা তুমি ।।৩।।

👉 আমি রাগ-হিংসা-লোভ-মোহ আদি কোনো বিকার নই , আমি সর্বনাশী মিথ্যা অহংকার নই আমি নিঁচু মানসিকতা সম্পন্ন ক্ষীণভাবা কোনো ক্ষোভগ্রস্থও নই । আমি ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষাদি চার পুরুষার্থ প্রাপ্তির আনন্দের বশে নাচতে বা ঝুমতে থাকা কোনো জীব-ক্লীব এসমস্তের কিছুই নই । মূলত ,আমার এই দৃশ্যমান নশ্বর জড় মাংসলদেহের ভেতরে অগোচরাবস্থায় থাকা শাশ্বত সনাতন শুদ্ধ চৈতন্য আত্মতত্বরূপী পরমাত্মা শিবই ( তুমিই ) , প্রকৃতপক্ষে আমি ।

না পাপ পূণ্য কর্ম না সুখ দুঃখ ভয়

নই বেদ তীর্থ যজ্ঞ পূজার অভিপ্রায় ।

না ভোজন বা ভোজ্য নই ভোক্তা আমি

জড় এই দেহের শিব চেতনাত্মা তুমি ।।৪।।

👉 আমি পাপ-পূন্যাদি কর্মও নই আর না সেই কর্মের ফল , আর না আমার আছে সুখের আনন্দ-উল্লাস আর না দুঃখের ভয় । আমি বেদশাস্ত্র তীর্থ যজ্ঞ পূজাদি শ্রৌত কর্ম কোনো উদ্দেশ্য বা ইচ্ছে পূরণের আশায় করিও না , কারণ আমি তো কামনা আশা ইচ্ছাদি বিষয়-আশয় হতে  ঊর্ধ্বস্থিত মুক্ত । না কেউ আমাকে ভোগ করে না কাউকে আমি ভোগ করি আর না তো কেউ আমার দ্বারা কাউকে ভোগ / প্রাপ্ত করে । মূলত ,আমার এই দৃশ্যমান নশ্বর জড় মাংসলদেহের ভেতরে অগোচরাবস্থায় থাকা শাশ্বত সনাতন শুদ্ধ চৈতন্য আত্মতত্বরূপী পরমাত্মা শিবই ( তুমিই ) , প্রকৃতপক্ষে আমি ।

না মৃত্যুর ভয় নেই জাতি বর্ণ আমার

পিতা মাতা নেই কেউ না জন্মাই বারম্বার ।

নই গুরুশিষ্য মিত্র না কাউকেই প্রণমি 

জড় এই দেহের শিব চেতনাত্মা তুমি ।।৫।।

👉 আমার মৃত্যু বা কালের ভয়ও নেই , না আমার কোনো জাত-পাত বর্ণের ভেদ আছে , আমি এই সৃষ্টি চক্রের গোলকধাঁধায় ফেঁসে থাকা জীবেদের ন্যায় জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ হয়ে বারম্বার জন্মগ্রহণও করি না আর না মৃত্যুপ্রাপ্ত হই , আমার ওপর এসব কোনো প্রাকৃতিক নিয়মই খাটে না । না আমি কারোর গুরুশিষ্য আর না কেউ আমার গুরুশিষ্য , আমার কোনো শত্রু-মিত্রও নেই আর না আমি কাউকে আলিঙ্গন বা প্রণাম করি , কারণ , আমার এই দৃশ্যমান নশ্বর জড় মাংসলদেহের ভেতরে অগোচরাবস্থায় থাকা শাশ্বত সনাতন শুদ্ধ চৈতন্য আত্মতত্বরূপী পরমাত্মা শিবই ( তুমিই ) , প্রকৃতপক্ষে আমি ।

নিষ্কল অগম্য আমার দিব্য স্বরূপ

আমি ইন্দ্রিয়াতীত ব্যাপ্ত চরাচর সুরভূপ ।

নই বদ্ধ না মুক্ত এক শুদ্ধ সদা আমি

জড় এই দেহের শিব চেতনাত্মা তুমি ।।৬।।

👉 অদ্বিতীয় অখণ্ড সকলের অগম্য নির্গুণ এমনই আমার পরমদিব্য জ্যোতির্ময় স্বরূপ । আমার রূপ সকলের সমস্ত বোধ-বুদ্ধি জ্ঞান-কর্ম আদি ইন্দ্রিয়ের অতীত এবং আমি সমগ্র চর-অচর ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সর্বত্র বিরাজমান সকল মঙ্গলময় পরমদৈব সত্ত্বা বা তত্ত্বের অধিপতি । আমি কোনো মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ নই , তবুও আমি সমস্ত মায়ার ঊর্ধ্বে থাকা সকল বিকার হতে মুক্ত হয়েও এই মায়ার সংসারের প্রতিটা বিষয়বস্তুর মধ্যেই চির শুদ্ধ ভাবে মঙ্গলময় পরম দিব্যসত্ত্বা স্বরূপে অবস্থান করি , কারণ , আমিই সেই এক ও অদ্বিতীয় শাশ্বত সনাতন সদা শুদ্ধ চৈতন্য আত্মতত্বরূপী পরমাত্মা শিব , যিনি পঞ্চভূত দ্বারা তৈরি আমার এই দৃশ্যমান নশ্বর জড় মাংসলদেহের ভেতরে অগোচরাবস্থায় চৈতন্য চিদাত্মা রূপে সদা বিরাজিত একমাত্র পরমসত্য ।


ফলশ্রুতি


আমি বা তুমি লক্ষ চুরোয়াশি জীব 

সবেতেই স্থিত এক পরমতত্ত্ব শিব ।

রচেন রুদ্রনাথ ইহা বেদসার বচন 

সর্বজীবে শিবভাব অজ্ঞান মোচন ।।৭।।

👉 আমি তুমি বা ৮৪ লক্ষ যে জীব যোনি রয়েছে , সেই সকলের মধ্যে আত্মতত্ত্ব রূপে এক পরমসত্ত্বা শিবই স্থিত । এই জ্ঞান যা বেদের সার বচন তাকে জেনেই আমি শ্রী রুদ্রনাথ শৈব এই আত্মতত্ত্বময় স্তুতিটির রচনা করেছি । এই স্তুতির সারার্থ বুঝে যে "সকল জীবের মধ্যেই এক শিবই রয়েছেন দ্বিতীয় কিছু না" এই মূলতত্ত্বকে জীবনে উপলদ্ধ করতে সক্ষম হয় , তার সমস্ত অজ্ঞান নাশ হয় ।

লোভ দ্বেষ মিথ্যা অহংকার বর্জন

পঠিলে ভক্তিতে হয় আত্মজ্ঞানার্জন ।

যাহা সত্য তাহা শিব চিরোসুন্দরম 

চিদানন্দময় সেই আমিই শিবহোহম ।।৮।।

👉কোনো মানুষ নিজের লোভ দ্বেষ হিংসা মিথ্যা অহংকারাদি বিকার ত্যাগ করে শ্রদ্ধাযুক্ত বিনম্র ভক্তিভাবে এই স্তুতির পড়লে নিশ্চিত ভাবেই সেই আত্মজ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হয় ।  যেমন ঈশ্বর সত্য , সেই সত্যই একমাত্র শিব আর এই শিব মূর্তিই অদ্বিতীয় চির সুন্দর । এরূপ সৎ চিৎ ও আনন্দ যুক্ত শিবই হলাম আমি । 



।। ইতি আত্মনির্বাণ ষষ্ঠক স্তুতি সম্পূর্ণ হোলো ।।



এই স্তোত্রটির বাংলা পদ্যাকার ভাষায় 

অনুবাদক ও রচয়িতা :- শ্রীরুদ্রনাথ শৈব জী


©RudraNath_Shaiva


পোস্টটির কপিরাইট ও প্রচারে - শৈবসাহিত্য Blog 


।। শ্রীগুরু দক্ষিণামূর্তয়ে নমঃ ।।

।। সদাশিবম ভজাম্যাহম ।।

সোমবার, ১৬ জুন, ২০২৫

শ্রীশিবতাণ্ডব স্তুতি / shree shivtandav stuti


১৬ ই জুন , ২০২৫ 

শ্রী চিদম্বর নটরাজ জয়তু 🚩


🪔 শ্রীশিবতাণ্ডব স্তুতি ( সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় পদ্যাকারে রচিত ) : - 

( মূলত সংস্কৃত ভাষায় রচিত শিবতাণ্ডব স্তোত্রম টি অত্যন্ত মন্মোহক একটি সংস্কৃত শিব স্তুতি । বর্তমান সমাজে এটিকে নিয়েই একটি ভূল তথ্য ছড়িয়ে আছে চারিদিকে যে , এই স্তোত্র টি নাকি শিবভক্ত দশানন রাবণ দ্বারা রচিত যা শিবের খুব প্রিয় । কিন্তু আমাদের সমাজে ২৬০ টিরও অধিক রামায়ণের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার সংস্করণ পাওয়া যায় , না সেগুলিতে আর না কোনো পৌরাণিক শাস্ত্রের কাহিনীতে রাবণকৃত এই শিব স্তোত্র এর কোনো উল্লেখ আছে ,, এমনকি সর্বাগ্রে মান্য রামায়ণের আদিকবি বাল্মীকি দ্বারা রচিত বাল্মীকি রামায়ণ এ পর্যন্ত এই স্তোত্র টির কোনো উল্লেখ নেই , সেখানে স্পষ্ট লেখা রয়েছে যে - " কৈলাস পর্বতের নিচে চাপা পড়ে রাবণের স্থিতি যখন পাতালে হয় তখন রাবণ এই পীড়া ও অবস্থা থেকে বাঁচতে তার মন্ত্রীমণ্ডলের কথায় শিবকে প্রসন্ন করতে হাজার বছর ধরে সামবেদের মন্ত্র সুক্ত পাঠ করেন , তখন গিয়ে শিব তাকে সেই পীড়া থেকে মুক্ত করেন । " সাক্ষাৎ পরম ঈশ্বরকে এত সহজে সন্তুষ্ট করে বরদান পাওয়া যায় দেখে ও জেনে রাবণ সেই সময় থেকে নিজের স্বার্থে শিবের ভক্তি করা শুরু করেন , এটি রাবণ রচিত কখনোই নয় । 

এই স্তোত্রটির উৎস বিষয়ে একটি অস্পষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ বা উল্লেখ শোনা যায় । সেই প্রমাণ কাহিনী অনুযায়ী , খ্রিষ্টীয় ১১০০ শতকের সময় সম্ভবত মধ্য-দাক্ষণীয় ভারতের একটি সাম্রাজ্যের রাজার মন্ত্রী মণ্ডলের রত্নসভার নাট্যশাস্ত্রের এক মহাজ্ঞানী পণ্ডিত নাট্যকার রাজ্যে "দশেহরা" তিথিপোলক্ষ্যে রাজসভা দ্বারা আয়োজিত রামলীলা নাটকের রাবণ চরিত্রটির জন্য যে সংলাপ লেখেন , তারই মধ্যে রাবণ দ্বারা শিবের ভক্তি ও পাণ্ডিত্যকে দর্শানোর জন্যে এই স্তোত্রটি তিনি রচনা করেন , যা সেই রামলীলার রাবণ চরিত্রটি গায়ন করে ও এটির সুর শব্দ ছন্দ এতটাই সুন্দর ছিল যা সকলের হৃদয়ে গেঁথে যায় ও সেই থেকে আজও অব্দি সকলের দ্বারা এটি "রাবণ রচিত শিব তাণ্ডব স্তোত্র" বলে প্রচলিত ।


তাই এই মূলসংস্কৃতে রচিত শিবতাণ্ডব স্তোত্রম টির অনুপ্রেরণায় বাংলার শিবভক্তদের কথা মাথায় রেখে ও তাদের পড়বার, বোঝবার সুবিধার্থে এই শ্রীশিবতাণ্ডবস্তুতি টি প্রথম বাংলা ভাষায় পদ্যাকারে নিজের মতন করে নিজের ভাব ও কবিশৈলীর দক্ষতা অনুযায়ী অনুবাদ ও রচনা করলাম , যেহেতু বাংলার অনেক শিব ভক্তরা রয়েছেন যারা সংস্কৃত বা হিন্দি আদি ভাষায় রচিত বা লিখিত স্তব স্তোত্র বুঝতে বা পড়তে , উচ্চারণ করতে পারেন না , তাই মাতৃভাষা বাংলাতে তাদের ও সকল বঙ্গ সনাতনীদের পড়বার বোঝবার জন্যে সহজ সরল শব্দযোগে এটির রচনা । )


।। সর্বসত্বকল্পের অষ্টভুজযুক্ত বামপদোর্দ্ধকাবস্থায় নৃত্যরত অপস্মরমর্দক শ্রীচিদম্বর নটরাজ শিব ।।




🚩 শ্রী শিবতাণ্ডব স্তুতি ( সম্পূর্ণ বাংলায় ) : -


( সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় পদ্যকার ও বঙ্গানুবাদ সহিত )



জটা অরন্যে স্থিত গঙ্গা শুদ্ধ করে সংসার 

ডমহ্ডম ডমরুক ধ্বনি গলায় সর্পলংকার ।

প্রচণ্ড তাণ্ডব নৃত্যে নাচেন স্বয়ং নটরাজ

কৃপা করুক সেই তিনি যাহার এমন বিচিত্র সাজ ।।১।।


👉 যার গভীর ঘন অরন্যরূপী জটাজাল মধ্যে সমাহিতা সুরধুনী গঙ্গার ধারা ভূতলে পতিত হয়ে সমগ্র সংসারকে পবিত্র করেন , সর্পরাজ বাসুকি যার গলার দোদুল্যমান অলংকার , যার হাতে থাকা ডমরু নামক বাদ্যযন্ত্র হতে প্রকাশিত ডম ডম ডম সুন্দর নাদশব্দ ছন্দের তালে যিনি নিজেই আনন্দ মগন হয়ে প্রচণ্ড উল্লাসের সাথে লাস্য তাণ্ডব করেন , সেই নৃত্যাদি সকল কলাকুশলীর দেবতা নটরাজ যার এমন বিরূপ বিচিত্র তাত্ত্বিক বেশভূষা , তিনি সর্বদা আমার ওপর তার কৃপাদৃষ্টি নিক্ষেপ করুক ।

পরম পবিত্রা মন্দাকিনী ভীষন তীব্র বেগে

জটাতে করছে ক্রীড়া দেখছে সকল সৃষ্টি জেগে ।

ধধগ ধধগ নেত্রে অগ্নি ললাটে চন্দ্র হাসে 

প্রণাম করি এমন দেবে কাল কাঁপে যাহার ত্রাসে ।।২।।


👉 যিনি দেবতাদের সহ ঘোর থেকে ঘোরতর অন্যায় করা পাপীরো পাপ হরণ করেন সেই পরমা পবিত্রা ভগবতী গঙ্গা যিনি ব্রহ্মা কমণ্ডল হতে ভীষন তীব্র বেগে মর্তের দিকে ধাবিত হলে ধরিত্রী মাতা সহ সকল সৃষ্টি ভীত হয়ে তার বেগ কে ধারণ করে সৃষ্টি কে রক্ষার্থে শিবের শরণ নিলে যিনি গঙ্গাকে এক ক্ষণের মধ্যেই তার জটাতে বন্দী করে নেন , এখন সেই তীব্রবেগী গঙ্গায় কেমন শান্ত মন্দস্রোতা মন্দাকিনী হয়ে যার জটা মধ্যে খেলা করছে , তাই দেখে সকল সৃষ্টিই হতচকিত । আবার , তার ললাট ভালে চতুর্থী তিথির সমান সুন্দর চন্দ্রমা ও কপালে ভীষন এক ত্রিনয়ন হতে ধক ধক ধক শব্দে অগ্নিতেজ স্ফুরিত হচ্ছে , এমন ঈশ্বরকে প্রণাম জানাই যার ত্রাসে সাক্ষাৎ সময় বা কালরাজ মৃত্যু দেবতা যমও ভীতসন্ত্রস্ত ।

নগেন্দ্রকন্যা উমা সদাই স্থিত যাহার সঙ্গে 

দশদিক হতে নজর তাহার সকল নাট্যরঙ্গে ।

কৃপাতে যাহার জীবের সকল বাধা বিপত দূর হয়

মহান তিনিই পরমকারণ নেই এতে কোনো সংশয় ।।৩।।


👉 গিরিরাজ হিমালয় কন্যা পার্বতী সদা সর্বদা যার সাথে সঙ্গিনী হয়ে স্থিত রয়েছেন , যিনি দশদিক / সর্বত্র হতে এই সৃষ্টিরূপী মায়ার জাগতিক রঙ্গমঞ্চে ঘটে চলা প্রতিটা নাটকের ওপর নিজের দৃষ্টি রাখছেন সেই যার কৃপায় জীবের সকল বাধা বিপদ মায়া মোহ ভ্রমত্যাদি নাশ / দূর হয় , তিনিই যে সকলের আদি , সর্বশ্রেষ্ঠ ও সমস্ত কারণের কারণ একমাত্র পরমোকারণ এতে কোনো সংশয় নেই । 

জটা মুকুটে বাধা নাগ মণির ভীষন ছটায় 

পিঙ্গল বর্ণজ্যোতি জীবের চিত্ত বিকার ঘটায় ।

মদমত্ত গজরাজ চর্মে শোভিত যাহার কটিভাগ 

সেই ভূতভাবন শিবের প্রতি থাকুক সদা মোরানুরাগ ।।৪।।


👉 যার জটামুকুটের জ্যোতির ছটায় এমন , যেনো মনে হয় জটাতে কোনো নাগমণি বাঁধা রয়েছে , যার দেহের বর্ণ অগ্নির সমান পিঙ্গল-স্বর্ণ আভার তেজোজ্যোতি দেবাদি সকল জীবের চিত্তকে চঞ্চল বা মুগ্ধস্মিত করে , মিথ্যাহংকারে চুর নিজের ভক্ত গজাসুরকে বধ করে আবার তার দেহের চর্মকেই নিজের কটিভাগের বস্ত্র বানিয়ে ভক্তকে কৃপা করেছেন , সেই ভূতের প্রতিও প্রীতি দেখানো ভক্তবৎসল ভূতনাথ শিবের প্রতি আমার আজন্ম-মৃত্যু শ্রদ্ধানুরাগ ভক্তিভাব থাকুক ।

স্বর্গাদিদেব যখন তাহার চরণকমল মাথায় ধরে

সেই পদ হতে পতিত ভস্মে দেবললাট তিলক করে ।

অশেষ-শেষনাগে বাঁধা জটায় শীতল চন্দ্রমা

সেই চন্দ্রচূড়ের কৃপায় মোর বাড়ুক শ্রী-যশ-গরিমা ।।৫।।


👉 পূজা-সেবার ইচ্ছায় হোক বা মোক্ষলাভের আশায় হোক , ব্রহ্মা-বিষ্ণু-ইন্দ্র আদি স্বর্গস্থিত দেবতারা যার চরণযুগলকে নিজ নিজ মস্তকে ধারণ করবার সময় তার চরণে ও গাত্রে লেপিত ভস্ম ভূমিতে পতিত হলে সেই ভূপাতিত ভস্ম ব্রহ্মাদি দেবতারা তাদের স্বীয় স্বীয় কপালে তিলক রূপে ধারণ করেন । নাগরাজ শেষানন্ত পেঁচানো যার ধূসর বর্ণের জটায় ছোট্ট চন্দ্রমা বিরাজিত , সেই চন্দ্রচূড় ভগবানের কৃপায় আমার শ্রী-সম্পত্তি জ্ঞান সামর্থ্য প্রতিপত্তি আদি যশ খ্যাতি বাড়ুক এই প্রার্থনা । 

ললাট ত্রিনেত্র হতে প্রকাশিত অগ্নি বিচ্ছুরণ

যাহার বশে জগত সেই কাম জ্বলে হোলো মরণ ।

ইন্দ্রাদিদেব দানব নিত্য পূজা জপ করেন যাহার

দয়া করুক সেই তিনিই যিনি প্র-পঞ্চভূত সার ।।৬।।


👉 যেই কামদেব মদনের ইশারার বশবর্তী হয়ে সমস্ত জীব জগত চলে এমন দুর্জেয় কামদেবকে যিনি তার ললাটে থাকা তৃতীয় নেত্র হতে স্ফুরিত ভীষন অগ্নিরাশি তেজ দ্বারা দগ্ধ করেছেন , ইন্দ্রাদি দেবতা অসুর মানব পশু জীব ও ভূতগণ যার নিত্যদিন পূজা জপ ধ্যান করে , সেই তিনিই যিনি প্রপঞ্চময় জগতের সারতত্ত্ব ও পঞ্চভূতের অধীশ্বর আমাকে সর্বদা দয়া করুক এমন আমার কামনা ।

ত্রিনেত্রানল হতে যিনি করেছেন মদন মর্দন

যেই ত্রয়ম্বকের কৃপায় হয় জীবের পুষ্টি বর্ধন ।

পার্বতীর স্নিগ্ধা মুখশ্রী কারণ যাহার আনন্দের

সেই ত্রিনেত্রের কৃপায় গতি হয় যেনো এই মন্দের ।।৭।।


👉 যিনি তার তৃতীয় নেত্রের অগ্নি দ্বারা মদন দেবকে ভস্মীভূত করেছেন , সেই যেই তিন নেত্রযুক্ত ঈশ্বরের কৃপায় জীব সমূহের জীবন নিরোগ সুন্দর সুস্থ সবল ভাবে কাটে , পার্বতীর শান্ত স্মিতা মুখমণ্ডল দেখে যিনি আনন্দিত হন , সেই ত্রিনেত্র শিবের কৃপায় যেনো আমার মত মন্দের দেহান্তে সদগতি হয় । 

কন্ঠ যাহার নীলাভ সমান নবীন শ্যাম মেঘকায় 

সমুদ্র মন্থনের গরল যিনি ধরেছেন নিজ গলায় ।

নরসিংহ চর্মবস্ত্র পরে পালেন যিনি এই সংসার

মহাপ্রলয় কালে তিনিই বিনাশো লয় করেন আবার ।।৮।।


👉 বৃষ্টির পূর্বে আকাশের বুকে যেমন শ্যামল বা কালচে বর্ণের মেঘরাশি নতুন করে জমে থেকে আকাশকে আচ্ছাদিত করে ফেলে সেরকমই , সমুদ্র মন্থন হতে উৎপন্ন জগত বিপন্নকারী ভীষন হলাহল বিষকে যিনি নিজের কণ্ঠে ধারণ করার ফলে তার কন্ঠ নীলচে বর্ণের আভায় আভরিত হয়েছে , যিনি বিষ্ণুর উগ্র নরসিংহ অবতারকে দমন করে সেই ছালকে নিজের বস্ত্র বানিয়ে সৃষ্টিকে রক্ষা করেছেন ও যিনি সর্বদা জগতকে পালন বর্ধন করেন সেই তিনিই আবার সৃষ্টির অন্তে মহাপ্রলয়ের সময় তার পালিত সৃষ্টির সমস্তকিছুর সংহারও করেন ।

নীলকমল পুষ্পে যাহার গলদেশ সদা সুশোভিত 

চঞ্চল চিত্ত মৃগের ছাল সদা দেহে পরিহিত ।

দক্ষ ত্রিপুরও অন্ধকের যিনি হরেছেন অহংকার

ভক্তিতে ভজি তাহারে যিনি অখিল বেদ-ব্রহ্মসার।।৯।।


👉 যার গলায় নীলপদ্মের মাল্যলংকার নিত্য শোভা পায় , চঞ্চলমনা কৃষ্ণমৃগ ও স্বর্ণমৃগ হরিণের ছাল দ্বারা যার বাম কাঁধ হতে বুক পর্যন্ত শরীর আবৃত , সেই যিনি প্রজাপতি দক্ষ , অজেয় ত্রিপুরাসুর ও অসুররাজ অন্ধকের অহংকার কেও হরণ করেছেন , আমি ভক্তিভাবে নত হয়ে বেদাদি অখিল শাস্ত্রে বর্ণিত যিনি একমাত্র ব্রহ্ম , সেই তারই সদা সর্বদা ভজনা করি ।

সমগ্র শক্তি যাহার ইচ্ছে মাত্র হতে প্রকাশিতা 

মহেশ্বরী সদাই তাহার বাম অঙ্গেতে বিরাজিতা ।

গজরাজ ইন্দ্র যমের দর্প যিনি করেছেন চুরমার

সেই নির্বিকার দেবের কাছে করি আমি নতি স্বীকার ।।১০।।


👉 যার ইচ্ছা হতে তার নিজ হৃদয়ে অবস্থিতা চিৎশক্তি স্বরূপা আদ্যাশক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে , সেই আদ্যাশক্তি ভগবতীই মহেশ্বরী রূপে যার বামপার্শ্বে নিত্য বিরাজ করছেন , যিনি গজরাজ গজাসুর দেবরাজ ইন্দ্র ও ধর্মরাজ যমের অহংকার কেও দুর্দণ্ড প্রতাপতার সাথে চূর্ণ-বিচূর্ণ করেছেন , সেই নির্লিপ্ত নিশ্চল নিরহংকারী নির্বিকার দৈবত্ব সম্পন্ন দেবতার কাছে আমি স্বেচ্ছায় নতি স্বীকার করি ।

জটাতে লিপ্ত সর্পেরো ফোঁস ফোঁস শ্বাস শব্দ

ললাট নেত্র স্ফূরিত তেজে সকল সৃষ্টি জব্দ ।

ধিম ধিমিক মৃদঙ্গ তাল কৈলাসে উঠেছে আজ 

নাচিছে তাণ্ডব দেখো ওই সৃজন ছন্দে নটরাজ ।।১১।।


👉 যার জটাতে পেঁচিয়ে থাকা সর্পের নিঃশ্বাস হতে নির্গত ফোঁস ফোঁস শব্দের আওয়াজ সকল সৃষ্টির মনে ভয় ধরিয়ে দেয় , যার ললাট নেত্র থেকে নির্গত হওয়া ভীষণ অগ্নি তেজের প্রভাব সকল সৃষ্টিকে জব্দ ( বিধ্বংস ) করতে সক্ষম , আজ সেই বিধ্বংসকারী দেবতাই নটরাজ রূপে কৈলাসে মৃদঙ্গের ধিমিক ধিমিক তালে নতুন সৃষ্টির ইচ্ছায় আনন্দ তাণ্ডব নৃত্য করছেন ।

প্রস্তর বা গন্ধপুষ্প হোক সর্পাদি মুকতা রত্ন 

নেই শত্রু মিত্রে ভেদ তিনি করেন সমান যত্ন ।

রাজা প্রজা ভিখারী বা ক্ষুদ্রতি ক্ষুদ্র কিট জীব

সমান সবাই যাহার কাছে তিনি তো সত্য সদাশিব ।।১২।।


👉 যার কাছে পাথর সুগন্ধি ফুল-ফল বা বিষাক্ত সর্প মুক্ত রত্নাদি মনি-মানিক্যাদি বস্তুতে কোনো ভেদ নেই , শত্রু মিত্র নির্বিশেষে সকলের দেওয়া পূজাপোচার ভোগ-নির্মাল্যকে যিনি সমান যত্নাভাবে গ্রহণ করেন , সুরাসুর রাজা প্রজা ভিখারী পশু পাখি বৃক্ষ সহ ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র কিট পতঙ্গাদি জীব সকলেই যার কাছে এক সমান প্রিয় , যিনি এমন সমদর্শী ঈশ্বরত্ব ভাবযুক্ত, তিনি একমাত্র সত্য সনাতন পরমেশ্বর সদাশিব ছাড়া আর কেউ হতেই পারেন না ।

ভস্মের ত্রিপুণ্ড্র ভাল ঐ শশাঙ্ক যাহার ললাটে 

করি এমন দেবের পূজা বসে নীরব গঙ্গার ঘাটে ।

হাত জোড়ে করি প্রণাম শিব নাম জপি সদা মুখে

বাকি যেটুকু ইহকাল কাটে তা যেনো পরমসুখে ।।১৩।।


👉 যার কপাল ভস্ম দ্বারা অঙ্কিত ত্রিপুণ্ড্র নামক সনাতন তিলক ও ললাট অর্ধচন্দ্রমা দ্বারা সুসজ্জিত , গঙ্গা নদীর তীরে বা কোনো পবিত্র ভূমিতে বসে নিশ্চল মনে আমি সেই দেবতারই পূজা করি , প্রণাম করি ও সদা সর্বদা মুখে "শিব" এই দ্ব্যাক্ষরী দিব্যনাম জপ করতে থাকি , যাতে এই সংসারে আমার আর বাদবাকি যেটুকু জীবন আছে , শিবের কৃপায় তা যেনো ভয় মোহ দুঃখ কষ্ট রহিত হয়ে পরম আনন্দে কেটে যায় ।

এমন শিবস্তুতি সদাই করেন যে পঠন স্মরণ 

অন্তে শিবের কৃপায় শুদ্ধ পারে সে ভব তরণ ।

শিবঃ শিব চিন্তনে তাহার সকল মোহ বিনাশ হয়

শিবভক্তিতে ডুবিছে যে কিসে তাহার দুশ্চিন্তা ভয় ।।১৪।।


👉 এমন সুন্দর শিব স্তুতির যে নিত্য পাঠ স্মরণ বা এর অর্থ অন্যের সম্মুখে বর্ণনাও করেন , ভগবান শঙ্করের কৃপায় সেই ব্যক্তির লোভ মোহ বিকার বিনষ্ট হয়ে পরম জ্ঞানযুক্ত হয় ও শিব কৃপাতেই সকল চিন্তামুক্ত হয়ে সারাজীবন শুদ্ধ সাত্ত্বিক ভাবে জীবন অতিবাহিত করে অন্তিমকালে এই ভব সংসার হতে পার হয়ে যায় , কারণ যে শিবের ভক্তিমার্গে শিবের চিন্তন-পূজনে একবার মজেছে , তাকে ইহসংসার জগতের আর কোনো দুশ্চিন্তা ভয় বিকার গ্রাস করতে পারে না । 

মধ্যাহ্ন প্রাত সন্ধ্যাকালে শিবপূজার শেষে

রুদ্রনাথ রচিত ইহা পাঠ করে যে ভালোবেসে ।

অসীম অনন্ত শক্তি-শৌর্যে ভক্তে প্রতাপ বাড়ে 

ইন্দ্রাধিক লক্ষ্মী-যশ তাহার গৃহদ্বারে কড়া নাড়ে ।।১৫।।*


👉 প্রাতকাল মধ্যাহ্নকাল সান্ধ্যকাল বা রাত্রিকাল যখনই হোক যেকোনো সময়েই কৃত শিবপুজার শেষে , রুদ্রনাথ শৈব দ্বারা রচিত এই স্তুতিটি বিনম্র শ্রদ্ধা ভক্তিভাবে ভালোবেসে শিবের উদ্দেশ্যে যে কেউই পাঠ করে , সে যেমন অনন্ত শক্তি জ্ঞান শৌর্যের অধিকারী হয় তেমনি তার অভ্যন্তরে নিষ্কাম ভক্তিভাবেরও বোধোদয় হয় , স্বর্গাধিপতি ইন্দ্রোপেক্ষাও অধিক ধন যশ শ্রী খ্যাতি তার গৃহ দ্বারের সম্মুখে এসে দাড়িয়ে থাকে ।* ( ফলশ্রুতি ) 



 ।। ইতি শ্রীশিবতাণ্ডব স্তুতি সম্পূর্ণ হোলো ।।



এই স্তোত্রটির বাংলা পদ্যাকার ভাষায় 

অনুবাদক ও রচয়িতা :- শ্রীরুদ্রনাথ শৈব জী


©RudraNath_Shaiva


পোস্টটির কপিরাইট ও প্রচারে - শৈবসাহিত্য Blog 


।। শ্রীগুরু দক্ষিণামূর্তয়ে নমঃ ।।

।। সদাশিবম ভজাম্যাহম ।।



















শনিবার, ৩ মে, ২০২৫

শিবস্তুতিমাল্যাষ্টকম / shivstutimalyastakam ( সম্পূর্ণ বঙ্গানুবাদ অর্থ সহিত )


রা মে , ২০২৫

শ্রী শিবায় নমস্তুভ্যাং 🚩


🪔শিবস্তুতিমাল্যাষ্টকম ( সম্পূর্ণ বঙ্গানুবাদ অর্থ সহিত ) : -

( এই শিবস্তুতিমাল্যাষ্টকম শিবস্তোত্রটি আমার স্বরচিত যেটি মূলত দেবনাগরী অক্ষরে সংস্কৃত ভাষায় ভগবান শিবের প্রতি ভক্তিভাব থেকে নিজেই  রচনা করেছিলাম অনেক আগেই এবং এর অর্থও হিন্দিতে অনুবাদ করেছিলাম । কিন্তু বাংলার অনেক শিব ভক্তরা রয়েছেন যারা সংস্কৃত বা হিন্দি আদি ভাষায় রচিত বা লিখিত স্তব স্তোত্র বুঝতে বা পড়তে , উচ্চারণ করতে পারেন না , তাই মাতৃভাষা বাংলাতে তাদের ও সকল বঙ্গ সনাতনীদের পড়বার বোঝবার জন্যে সহজ সরল ভাবে সংস্কৃত যুক্তাক্ষরগুলিকে ভেঙে ভেঙে অর্থ সহিত অনুবাদ করে প্রকাশ করলাম আজ । )


 ব্রহ্মকপাল ভিক্ষাপাত্রধারী ভগবান শিবের শ্রীশ্রী ভিক্ষাটন ভৈরব লীলামূর্তি 



🚩শিবস্তুতিমাল্যাষ্টকম ( সম্পূর্ণ বঙ্গানুবাদ অর্থ সহিত ) : -


( সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় অনুবাদ অর্থ সহিত )


ন যং নিয়ন্তুং শক্যস্যাৎ ন কালঃ

সাধয়েৎ যমঃ ন মায়য়া সংস্পৃশ্যোয়ং ।

ন বেত্তি ব্রহ্মবিত্তশ্চ ব্রহ্মর্বিষ্ণো

স্বর্গাদিদেব্যং নিত্যম অভিবাঞ্ছিতং ।।১।।

👉 না যাকে নিয়ম বেঁধে রাখতে পারে , না যাকে সময় ( কাল ) , না যম , না যাকে মায়া ধরতে ( স্পর্শ করতে ) পারে , না যাকে "অহং ব্রহ্মস্মি" বলা ব্রহ্মবিদেরাও এমনকি সাক্ষাৎ ব্রহ্মা বিষ্ণুও যারা সর্বজ্ঞ ভগবান বলে জ্ঞাত , তারাও সম্পূর্ণ জানতে পারেন , যাকে ( যার কৃপার অভয়হস্ত ও পরমপদকে ) স্বর্গাস্থিত ইন্দ্রাদি দেবতারাও নিত্য বাঞ্ছনা ( অভিলাষ ) করে থাকেন ,

স সৃষ্টিকালে শ্রীং দত্বা বিষ্ণবে

যস্যাংঘ্রীপদ্মং বসুধাধিপেন্দ্রঃ ।

কাঙ্ক্ষন্তি নিত্যং পরমেব গত্বুম্

স ত্যক্তসর্বো ধনরাজিবৃন্দঃ ।।২।।


👉 সৃষ্টির সৃজনকালে সমস্ত জগতের পরিপালনের জন্যে যিনি লক্ষ্মীদেবীকে ভগবান বিষ্ণুকে দান করেন, জগতের শ্রেষ্ঠ ঐশ্বর্য্যবান রাজাধিরাজেরা যার নিত্য পরম পাদপদ্ম প্রাপ্তির কামনা করেন , অথচ সেই তিনিই সমস্ত ধন-সম্পত্তি আদি সকল ঐশ্বর্য্য ত্যাগ করে ,


ভস্মাঙ্গধারী চ জটাকলাপং

ভিক্ষাটনং ব্রহ্মকপালহস্তম্ ।

বিচিত্রলীল্য রূপ্পরিভ্রম্য লোকাঃ

হসন্ত্যনা গিরিসুতা ত্বমীশম্ ।।৩।।


👉 সর্ব অঙ্গে ভস্ম মেখে , মাথায় বিশাল জটা ধারণ করেছেন ও ব্রহ্মাকপালকে ভিক্ষাপাত্র বানিয়ে হাতে ধরে অদ্ভুত এক অসংসারিক রূপে লীলার নিমিত্তে সমস্ত সংসারে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করে বেড়ান । সেই ঈশ্বরের এমন কাণ্ড দেখে গিরিরাজ কন্যা পার্বতী হাসেন ও ,


সংসারীণং নাম হসন্তি দেবী

কালেন দগ্ধং মদনং পুরস্তাৎ ।

স য়ো মুমোচোজ্জিত দৃষ্টিরগ্নিম্

স প্রক্ষমাণঃ প্রিয়য়া স্মিতদৃষ্টাত ।।৪।।


👉 হাসতে হাসতেই মজা করে দেবী তাকে "সংসারীন" বা "তুমি একজন সংসারী নাকি !" - এমন নামে ডেকে খোটা দিতে থাকেন , তখন সেই তিনিই যিনি অতীতে একবার কামদেবকে ভস্ম করেছিলেন , সেদিন যার দৃষ্টি হতে কামের বিরুদ্ধে ভীষন ক্রোধাগ্নি নির্গত হয়েছিল , সেই আবার তার প্রিয়ার স্মিতা-হাস্যরতা মুখমণ্ডলকে স্তব্ধ প্রেম দৃষ্টিতে দেখে উপভোগও করছেন । 


স শান্তমূর্তি ত্রক্ষ্যঞ্চম পরেশ

ভালেন্দু সর্বজ্ঞ মহাদেব শিবম্ ।

নমামি ভক্তিপূর্বং যং মহেশম্

যোগিপ্রিয়ং ত্রিশূলপাশ হস্তম্ ।।৫।।


👉 আমি ভক্তিপূর্বক প্রণাম করি সেই মহেশ্বরকে— যিনি শান্তমূর্তি , ত্রিনয়নযুক্ত , সর্বজ্ঞ , কপালে চন্দ্রধারী , যিনি সকল দেবতাদের আদি ও শ্রেষ্ঠ মহাদেব , যিনি মঙ্গলময় শিব ও সকল যোগীদের প্রিয় এবং যিনি হাতে ত্রিশূল ও পাশ ধারণকারী পরমেশ্বর ।


যো নাট্যরঙ্গে ভূতাদি নাথম 

বিহিতম্বশে ডমরুকনাদোন্মত্তৈঃ ।

প্রাণৈঃ সংচারিত জগতানি সর্ব

যঃ কালকূটং পীত্বা চ বিভর্তে ।।৬।।


👉 যিনি তার সৃষ্ট এই নাট্যরঙ্গমঞ্চে ( লীলাক্ষেত্র সমগ্র জগতে ) স্থিত প্রপঞ্চময় সকল তত্ত্বরূপী ভূতগণের ( পঞ্চভূত , ৬৪ তত্ত্ব , দেব , অসুর , জীব , পশু , কিট ) স্বামী ( অধিপতি ) , সমস্ত কিছুই তারই বশে , যার ডমরুবাদ্য থেকে উৎপন্ন নাদের শব্দকম্পে মোহিত হয়ে সমগ্র বিশ্বে প্রাণশক্তি সঞ্চারিত ( আন্দোলিত ) হয় ও সমগ্র জগত গতি পায় , যিনি কালকূট নামক ভয়ংকর বিষ পান করে তাকে কন্ঠে ধারণ করেন ,


বিষকণ্ঠ স নীলগ্রীব দেবঃ

দক্ষার্কবিষ্ণোর্ব্রহ্ম গণেশশক্র ।

স্মরাদিহংকার বিনাশয় যো যঃ

কৃপাঙ্কুরু ময়ি সদৈব পঞ্চবক্ত্র ।।৭।।

👉 সেই বিষকন্ঠে ধারণ করার ফলে গলা নীলবর্ণ হয়ে যাওয়া দেব নীলকন্ঠ , যিনি দক্ষ, সূর্য, বিষ্ণু, ব্রহ্মা, গণেশ, ইন্দ্র ও কামদেবের অহংকারকে বিনাশ করেছেন, সেই পঞ্চবক্ত্র শিব আমার প্রতি সদাসর্বদা তার কৃপাদৃষ্টি নিক্ষেপ করুন ।


ন স্তুতির্ন হি মে দক্ষন্ন যোগঃ 

ত্বং তত্ত্ব রূপং ন জানামি অহং ।

মাত্রেণভক্তি তুষ্টসি তস্মাৎ

শরণং গতস্ত্বং ভক্তৈকমিত্রং ।।৮।।


👉 না আমি আপনার স্তুতি করতে , না আমি আপনার ধ্যান, যোগ, পূজা-যজ্ঞ আদি কর্মে দক্ষ আর না আমি আপনার সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও পরমদিব্য স্বরূপকেও কিঞ্চিৎ জানি, তবুও আপনি শুধু মাত্র ভক্তিতেই সন্তুষ্ট হন - এই কারণেই আমি কেবল আপনারই শরণে আগত হয়েছি , হে ভক্তের একমাত্র বন্ধু স্বরূপ আশ্রয়দাতা ।


ফলশ্রুতি :


শিবস্তুতিমাল্যাষ্টকম্ পবিত্রং

ভক্তরুদ্রনাথেন বিরচিতম ।

যং পঠতি শ্রদ্ধয়া সদান্নরঃ 

সদা ভবেৎ প্রসন্নঃ শম্ভুম ।।৯।।


👉 এই পরমপবিত্র "শিবস্তুতিমাল্যাষ্টকম" স্তোত্রটি ভক্ত রুদ্রনাথ দ্বারা রচিত । শ্রদ্ধাসহকারে যে কেউ এই স্তুতির পাঠ করে , শম্ভু সর্বদা তার ওপর প্রসন্ন থাকেন ,


পাপানি হন্ত্রি সংসারপাশনাশী

দারিদ্র্যদুঃখপ্রশমনা প্রবীণঃ ।

অন্তে দদাতি শিবঃ পরমোপদম

ভক্তপ্রিয়ঃ করুণায় নিধানঃ ।।১০।।


👉 এবং ভক্তপ্রিয় করুণার আধার ভগবান শঙ্কর ভক্তের সকল পাপ সংসারপাশ মায়া দারিদ্র্যতাদি দুঃখসমূহকে দক্ষতার সহিত নাশ করে অন্তিমকালে ভক্তকে তাঁর পরমপদ ( কৈবল্যপদ ) রূপী মোক্ষ বা নির্বাণ প্রদান করেন ।




।। ইতি শিবস্তুতিমাল্যাষ্টকম সম্পূর্ণম ।।




মূল সংস্কৃতে স্তোত্র রচয়িতা ও বাংলা ভাষায়

অনুবাদক :- শ্রীরুদ্রনাথ শৈব জী


©RudraNath_Shaiva




পোস্টটির কপিরাইট ও প্রচারে - শৈবসাহিত্য Blog




।। শিব ওঁ তৎ সৎ ।।


।। ভক্তমন্দার সদাশিবায় নমঃ ।।